মাহমুদ হাফিজ
বশীর আল হেলাল (১৯৩৬-২০২১) বরেণ্য কথাসাহিত্যিক,গবেষক, ভাষাবিদ, শিশুসাহিত্যিক। কিন্তু একটি মাত্র বইয়ের মধ্য দিয়েই তাকে ভ্রমণগদ্যকার তকমা দিতে দ্বিধা হয় না। বইটির নাম ‘বেলগ্রেডের ডাক’। পরিমিত বাক্যখরচের পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে এ রচনাকে তিনি করে তুলেছেন ভ্রমণসাহিত্যের এক লুকানো মুক্তো- গভীর তলদেশ থেকে যাকে খুঁজে বের করে সামনে আনতে হয়। সরকারি আদেশে সাহিত্য সম্মেলনে দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে যুগোশ্লাভিয়া গেলেও বশীর আল হেলাল সহজাত ভাষাভঙ্গির লালিত্যে, বোধ ও উপলব্ধির স্বচ্ছতায় ‘বেলগ্রেডের ডাক’ ভ্রমণ বিবরণটি করে তুলেছেন নিজস্ব গদ্যগন্ধী, প্রাতিস্বিক এবং ভ্রমণসাহিত্যের এক আশ্চর্য উপাদান।
সমকাল বা ভাবীকাল ব্যক্তির সমগ্র শিল্পসত্তার বিচার কখনোই করে উঠতে পারে না-এটা সাহিত্যশিল্পের অলিখিত নিয়তি। আলোচ্যক্ষেত্রেও এটা ঘটেছে এতে কোন সন্দেহ নেই!
কোন নির্দ্দিষ্ট শিল্পকর্ম পাঠের মধ্য দিয়ে সৃজনশীলের অখন্ডমানসের খণ্ডিত অংশই উঠে এসে থাকে। সাহিত্য-শিল্পীর সৃজন ও আবিষ্কারশক্তি বিবেচনায় তাই সমকালের প্রবাহ,উত্থানকালের পারিবারিক-সামাজিক আবহ এবং সৃজনমানস গঠনের প্রক্রিয়ার পূর্ণ বিশ্লেষণ প্রয়োজন। এ পরিসর সেই অফুরন্ত সময় ও স্বাধীনতার জায়গা নয়; অতএব উপর্যুক্ত বিচার-মানদন্ডের কিয়দংশে আলোকসম্পাতের মধ্য দিয়ে লেখকের বিপুল রচনার ভিঁড় থেকে বের করে একে শ্রেণীতে ফেলে প্রাথমিক আলোচনার সূত্রপাত এ লেখার একটি লক্ষ্য হতে পারে। অতএব পাঠককে আপাতত: ক্ষীণচক্ষুর ভাসা ভাসা আলোচনা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হবে।
স্রষ্টাদত্ত সৃজনশক্তি, পারিবারিক সৃজনমুখী ঐতিহ্য,ভারত ও বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, পঠনঋদ্ধ মানসের ওপর ভর করে বশীর আল হেলাল যে উদারনৈতিক জীবনদৃষ্টি লাভ করেন,সেই সিনজন্ড জীবনদৃষ্টি ও সৃজনকীর্তির শিখরঅবস্থান থেকে তিনি আমাদের সামনে হাজির করেছেন ‘বেলগ্রেডের ডাক’। গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ,শিশু সাহিত্য এমনকি কবিতাসহ বিপুল রচনারাশির বিপরীতে ভ্রমণগদ্য শ্রেণীর ‘সবে ধন নীলমণি’ ‘বেলগ্রেডের ডাক’। ভ্রামণিকের দৃষ্টিকোণে যা সুলিখিত,ভাষার ললিতমাধুর্যে উত্তীর্ণ, বর্ণনার মুনশিয়ানায় মুগ্ধপাঠের।
লেখক আহমদ মাযহার এই বরেণ্যের জীবনচরিতকে যেভাবে খনন করেছেন- তাতে দেখা যাচ্ছে, ১৯৩৬ সালে হেলাল জন্ম নেন পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের তালিবপুর গ্রামের সম্ভ্রান্ত পরিবারে। উত্তরভারতের নামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও হেকিম পিতা সৈয়দ মুহাম্মদ আলী আসমার আরবি, ফার্সি ও উর্দু ভাষার পন্ডিত ছিলেন। এই ভাষায় সাহিত্য চর্চা করে সুনাম কুড়িয়েছিলেন। পিতামহও শিক্ষকতার পাশাপাশি ফারসি ভাষায় কবিতা চর্চা করতেন। উত্তর ভারতীয় মুসলিম সংস্কৃতির সঙ্গে বাঙালি সংস্কৃতির মেলবন্ধন ঘটেছিল তাদের পারিবারিক ঐতিহ্যে।
সাতচল্লিশের দেশভাগের পূর্ববঙ্গের হিন্দু ও পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমদের জীবনে -ভিটেমাটি ছেড়ে অন্য দেশ পাড়ি দেয়ার ঘটনা ঘটে, দেশভাগের সেই সংবেদনশীল অভিঘাতের শিকার হয় বশীর আল হেলালের পরিবারও। শিক্ষা ও বেড়ে ওঠার কালে বারংবার এদেশ-ওদেশ গতায়াতের মধ্য দিয়ে তার বেড়ে ওঠা। এ সময় দ্বৈরথের মধ্য দিয়ে জীবন এগুলেও জন্মগত উচ্চাকাঙ্খা আর কঠোর অধ্যাবসায় তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় ছেদ ঘটতে দেয়নি। দেশভাগের সময় তিনি দুই অগ্রজের অনুসরণে চলে আসেন রাজশাহীতে। মুর্শিদাবাদে প্রাথমিক শিক্ষার পর তাই মেট্রিকুলেশন পর্যন্ত তাঁর শিক্ষায় যুক্ত হয়ে যায় রাজশাহী ও দিনাজপুরের নাম। আবার দেশভাগের পরে ভারত-পাকিস্তান আলাদা দুটি দেশ হিসাবে থিতু হয়ে গেলে তার দুই অগ্রজ পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে চলে গেলেও তিনি চলে যান ভারতের কলকাতায়। এখানেই তাঁর কলেজজীবনের পাঠ চোকে। কলকাতা সরকারি কলেজ থেকে আইএ পাশ করে বাংলা অনার্সে ভর্তি হন জলপাইগুড়ির আনন্দচন্দ্র কলেজে। ১৯৫৭ সালে বিএ অনার্স সম্পন্ন করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬০ সালে এমএ পাশ করেন। শিক্ষাপাঠ চুকিয়ে তিনি কলকাতায় চাকরিজীবনে প্রবেশ করেছিলেন। ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধপরবর্তী দাঙ্গা পরিস্থিতি বশীর আল হেলালের জীবনে আরেকদফা দেশান্তরের ঘটনা নিয়ে আসে। ১৯৬৮ সালে তিনি মাকে নিয়ে ঢাকায় এসে বসবাস শুরু করেন। ১৯৬৯ সালে সহকারি পরিচাল হিসাবে যোগ দেন বাংলা একাডেমিতে। এরপর বশীর আল হেলাল এক ইতিহাস।
আলোচ্য ভ্রমণগদ্য ‘বেলগ্রেডের ডাক’ যখন প্রকাশিত হচ্ছে (১৯৯১), তিনি তখন আর মুর্শিদাবাদের তালিবপুর গ্রামের আরবি-উর্দু-ফারসি ভাষার পন্ডিত সৈয়দ মুহাম্মদ আল আসমার এর পুত্র সৈয়দ নেয়ামুল বশীর নন ( পিতৃদত্ত নাম); বাংলাদেশের কথাসাহিত্যিক বশীর আল হেলাল। কলকাতা থাকতেই ১৯৬৭ সালে তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘কুশীলব’ প্রকাশিত হয়ে গিয়েছিল। ছোটবেলা থেকেই তিনি লেখালেখির অভ্যেস ছিল তার। বাবা উর্দু ও ফারসি চর্চা করলেও সাহিত্যচর্চায় তিনি বেছে নেন বাংলা ভাষা। স্বাধীন বাংলাদেশের শুরু থেকেই একের পর এক প্রকাশিত হতে থাকে তাঁর সৃষ্টি। প্রথম কৃষ্ণচূড়া (১৯৭২) আনারসের হাসি (১৯৭৪) কিশোরগল্প সংকলনের পর প্রথম উপন্যাস কালো ইলিশ প্রকাশিত হয় ১৯৭৯ সালে। ঘৃতকুমারী(১৯৮৪), শেষ পানপাত্র (১৯৮৬), নূরজাহানদের মধুমাস (১৯৮৮), শিশিরের দেশে অভিযান(১৯৯০) এবং ‘সাম্প্রতিক কবি সাম্প্রতিক কবিতা’ (১৯৭৫),‘বাংলা গদ্য’ (১৯৮৫),’ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস’(১৯৮৫) ‘বাংলা একাডেমির ইতিহাস (১৯৮৬) প্রভৃতি উপন্যাস ও গবেষণাগ্রন্থের মধ্য দিয়ে কথাসাহিত্যিক ও গবেষক হিসাবে বশীর আল হেলাল এর পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ে। এ পর্যায়ে ১৯৯১ সালে প্রকাশিত হয় ‘বেলগ্রেডের ডাক’। ১৯৭৯ সালে বেলগ্রেড যাত্রার ওপর লেখা ভ্রমণগদ্যটি লেখা হয় ১৯৭৯-৮০সালে। ১৯৮০ থেকে ১৯৮১ পর্যন্ত তা ত্রৈমাসিক ‘পটভূমি’ পত্রিকায় প্রকাশিতও হয়। কিন্তু বই আকারে আরও দশবছর পরে প্রকাশিত হয় হওয়ায় এ ধারণা সঙ্গত যে বিপুল রচনা লেখা ও প্রকাশনার ভিঁড়ে ভ্রমণগদ্য’র পান্ডুলিপি লেখকের নিজের দেরাজেই অবহেলিত ছিল।
বহুলপ্রজ লেখকের ভ্রমণ-শ্রেণীর একমাত্র রচনা হিসাবে এর বিশ্লেষণ এ লেখার অন্যতম অন্বিষ্ট। রচনারাশির মধ্যে এর অবস্থান চিহ্নিত করার প্রয়োজনেই তাঁর জীবন চরিতের খানিকটা আর গ্রন্থ তালিকার অনেকাংশ উল্লেখের প্রয়োজন হলো।
‘বেলগ্রেডে ডাক’ভ্রমণগদ্যটিকে লেখক ২৪টি ভিন্ন ভিন্ন শিরোনামের অধীনে বিন্যস্ত করেছেন। বিন্যস্ত প্রথম অধ্যায়ের নামও বইটির নামে ‘বেলগ্রেডে ডাক’। উল্লেখেযোগ্য আরও কয়েকটি অধ্যায় হচ্ছে ‘বাঙালির সাধনা, যাত্রাভঙ্গ, হিথরো, অন্য দুনিয়ায় পা, ভ্যানগার্ড, স্কাদারলিয়া, টিটোর মধ্যপন্থী সমাজতন্ত্র, একলা দোস্তালি, তোমাকে মনে রাখব ইত্যাদি। স্বনামীয় বিন্যাসগুলো স্বাধীন ও পূর্ণ। মানে একটির সঙ্গে আরেকটির সূক্ষ্ণ-যোগ সত্ত্বও প্রতিটি গদ্য আলাদাভাবে সাহিত্যরস আস্বাদনযোগ্য। লেখক এই রচনাটিকে কোন শ্রেণীভূক্ত না করে তা ‘স্মৃতির ফুল’বলে অভিহিত করেছেন এবং এর মূল্যায়ণের ভার অনন্ত সময়ের ওপর ছেড়ে দিয়ে গেছেন। লেখা শুরু করে কোথাও আবার ভ্রমণবৃত্তান্ত বলেও অভিহিত করেছেন। যাহোক, এ রচনার অর্ধশতক পেরিয়ে এসে এখন এর আঙ্গিক ও শিল্পরস বিবেচনায় আমরা একে ভ্রমণগদ্য শ্রেণীতেই মূল্যায়ণে প্রয়াসী হয়েছি।
সাহিত্য সম্মেলনে দেশের প্রতিনিধি হয়ে আট দিনের যুগোশ্লাভিয়া যাত্রা এর কাঠামো মাত্র। কিন্তু অন্ত:সলিলে বয়ে গদ্যসাহিত্যের অপূর্ব ফল্গুধারা। যা টান টান, ঝরঝরে ও পাঠ আকর্ষণে উৎসাহ-জাগানিয়া। কিন্তু সে দেশে যাতায়াত, পথ ও সম্মেলনের মিথস্ক্রিয়া, নতুন একটি শহরকে প্রাণ ভরে দেখা, রোজকার মানবীয় রুটিনের খুটিনাটি সর্বোপরি থেকেই থেকেই জীবনের অমোঘ দর্শন ও সর্বজনীন উপলব্ধি বাঙ্ময় হয়ে উঠেছে এতে। আর তা বর্ণিত এক পরিণত কথাসাহিত্যিকের নিটোল, রসবোধসিঞ্চিত গদ্যে। যাত্রার শুরুতেই ভাবনাজাগিয়া গদ্যে লেখক এভাবে শুরু করছেন-
“কতকগুলি ভাবনা থাকে যা হয়তো কখনো ভাবাই হয় না্ কিন্তু সেই অভাবিত ভাবনা যখন বাস্তব রূপ নিয়ে এসে দাঁড়ায় তখন চমক লেগে যায়। মনে পড়তে দেরি হয় না এও আমার স্বপ্ন, এই স্বপ্ন কেবল সাহস করে দেখা হয়নি, এই যা!”(পৃষ্ঠা-১০)
বিদেশে গেলে নিজের দেশকে নতুনভাবে চেনা যায়, নতুনভাবে বিচার করতে ইচ্ছে হয়। লেখক এর ব্যতিক্রম নন-
“আমাদে এই দেশে প্রতি কাজে বাধা। বাধা ডিঙানোই আমাদের এই উচ্চিংড়ে জীবনের সাধনা। যুগোশ্লাভিয়া পাহাড়ে-ভরা দেশ, কিন্তু ওঁদের জীবনের পথ মসৃণ। বাংলাদেশ সাধের শ্যামল সমতলভূমি, কিন্ত এমনি ব্যাপক আমাদের বাধা ডিঙানোর সাধনা যে হঠাৎ যদি দেখি সামনে বাধা নেই আমরা হোঁচট খাই।“ (পৃষ্ঠা-১২)।
ভ্রমণবৃত্তান্তটি এগিয়েছে লেখকের সহজাত রসবোধউজ্জীবিত রসাত্মক গদ্যে…
“ঢাকা বিমানবন্দরে সেই ক্লান্ত দীর্ঘ জতুগৃহের ন্যায় ইমিগ্রেশনের লাইনে ঘর্মাক্ত কলেবরে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে যখন কাউন্টারে আমার পালা এল, ব্যক্তিটি আমার পাসপোর্ট কত কিছু যে খুঁজতে লাগলেন। বললেন, জি.ও. দেখান। আমি কলমনবিস আর নথিপতি বাঙালি, জি.ও.র সত্যায়িত নকল প্রস্তুত করে রেখেছিলাম। দিলাম এবং ভাবলাম, বেয়াদবিটা আগে-ভাগেই করে রাখা ভালো। যদি চেয়ে বসে তখন কী হবে?”(পৃষ্ঠা-১৩)
“বিমানের খাদ্য আমার ভালোই লাগে। সেটা হয়তোবা ওই ইংরেজি-বাংলার কারণেই। পেটে আছে অম্বল, একটুখানি ক্ষতও হয়তো আছে। ইংরেজি খাদ্যে স্বাদ নেই, স্বাস্থ্য আছে। বাংলা খাদ্যে স্বাদ এবং ঝাল আছে। দুইয়ের মিলন হলে আমার উদর এবং রসনার পক্ষে উত্তম হয়।“ (পৃষ্ঠা-১৭)।
এরকম গদ্যের মধ্যে বিমানযাত্রার প্রথম অভিজ্ঞতাকে মর্মে মর্মে উপভোগ করেন তিনি, পাঠককে নিয়ে যান জীবনের অমোঘ, গভীর, দর্শনভাবনায়….
“মেঘগুলি ফুলে ফুলে গুমরে গুমরে থমকে আছে। উপরে গহীন নীল আকাশ। ওই নীল যে অনন্ত মহাশুণ্য ছাড়া আর কিছুই নয় সেটা এই একত্রিশ হাজার ফুটের উচ্চতা থেকে প্রত্যয় না হয়ে উপায় থাকে না। কত রকমের ক্ষুদ্র সব বিশ্বাস দিয়ে আমরা আমাদের বুদ্ধিগুলোকে ক্ষুদ্র করে রাখি। এবং এমন মানুষ আছেন যাঁরা বুদ্ধিকে পাপ মনে করেন। এই অপূর্ব সমুচ্চ নভোদেশে বুদ্ধি আর হৃদয় দুটোই প্রসারিত হয়। বিমান-ভ্রমণের এটাও একটা লাভ।“(পৃষ্ঠা-২২)।
“আমি ভাবছি আমার সুটকেসটির কথা। তাকে কি আমি পাব? সেই ঢাকায় তার সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়ে গেছে। তখন ডাইনে গিয়ে নিচে নামার সিঁড়ি। পাশে এসক্যালেটরটি স্তুব্ধ হয়ে রয়েছে। সিঁড়ি অর্ধেক ভাঙা হয়েছে, দূর থেকে দেখি ঘুরন্ত কনভেয়ারের ওপর আমরে সেই নীল কৃশ সুটকেস নানা বর্ণের সুটকেসের সঙ্গে ঘুরতে ঘুরতে বৃহৎ ্এক থামের আড়ালে চলে যাচ্ছে। ….আপাতত এই জড়সঙ্গীকে দেখতে পেয়েই বড় আনন্দ হলো। “ (পৃষ্ঠা৩৮)।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘পারস্য যাত্রী’ভ্রমণগ্রন্থে আকাশে ওড়ার পর মাটির পৃথিবীর সঙ্গে হৃদয়ের নীবিড় সম্পর্কের কথা নানাভাবে বর্ণিত হয়েছে। ‘বেলগ্রেডের ডাকে’ লেখক ‘আকাশ-পাতাল ভাবনা’নামীয় অধ্যায়ে মেঘের রাজ্যে বসে আকাশ ও মাটির পৃথিবীর নানা ভাবনা ভেবে চলেছেন। বিমান এগুচ্ছে, তার স্বত:শ্চল গদ্য এগিয়ে যাচ্ছে আকাশ ও পাতালের নানা ভাবনার সঙ্গে….কখনো কখনো সেই ভাবনার বর্ণনা লেখচিত্র এঁকে দেয়…
“সেই মেঘের রাজ্যে রচিত হয়েছে বিস্তৃত এক খামারের দৃশ্য। কোথাও সমতল ক্ষেত্রে চাষ চলছে। দুই শুভ্র বলীবর্দ লাঙল টানছে, পেছনে দাঁড়িওলা কৃষক। তার সমতল ফসলের হিল্লোল। তার দেখা গেল টিপ টিপ খড়ের পালা।“ (পৃষ্ঠা-২৭)।
এ রচনা লেখক বশীর আল হেলাল এর উদার ও সংস্কারমুক্ত জীবনদৃষ্টির পরিচয়ও ফুটে উঠেছে। দেশের নারীদের পাশাপাশি বিদেশি বিমানবালার পরিচ্ছদ, শারিরীভাষার তুলনা করে তিনি নারীকে মানুষ হিসাবেই ভেবেছেন। সে প্রসঙ্গের দিয়েছেন চমৎকার ভাষারূপ…
“মেয়েদের ললিত লবঙ্গলতার মতো করে দেখতে বা পেত আমাদে অর্ধ-নারীশ্বর হৃদয় ভালোবাসে বলেই আমাদের ভাষাতেও ওইরকম সব ললিত এলায়িত শব্দ প্রচুর রচিত হয়ে আছে। নারীতে আমরা ব্যক্তিত্ব দেখতে চাই না বলেই ওইসব শব্দে আমরা তাদের ভূষিত করি। …জ্যাটের এই বিমানে মেয়েটি সামান্য ছিটের অতি সাধারণ একটি হাফ -শার্ট আর স্কার্ট পরেছেন। ব্যস, এই তার পোশাক। তারপর চুল বেটা ছেলের মতো করে ছাঁটা…। কে এঁকে বিমানবালা বলবে? মন ভোলানো বা যাত্রীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যে তার কাজ নয় সেটি সহজে বোঝা যায়। যে কাজ পুরুষের সে কাজ তাঁরও। তিনি বালা বা ললনা নন, তিনি নারী, তিনি মানুষ। তিনি কমও নন, বেশিও নন। নারী পুরুষের এই যে এঁদের প্রকৃত সমতা, অকৃত্রিম সমতা, এই জিনিসটি বড় ভালো।“(পৃষ্ঠা-৩৬-৩৭)
ভাষায় বিলীয়মান শব্দের প্রতি প্রগাঢ় টান- “ক্ষৌর সেরে প্রাণ ভরে স্নান করলাম”(পৃষ্ঠা-৪৫), আর দৃশ্যপট বর্ণনায় প্রবিষ্ট হয়েছে লেখকের শিল্পীমনের গভীর অনুভূতি…
“ডানহাতের কাছে কাচের দেয়ালের ওপরে বিপুল পর্দা ঝুলছে। ফাঁক দিয়ে সোনালী রোদ আসছে। আর একটু সরিয়ে বাইরে নজর ফেলে দেখি, হায় রে কান্ড ! নদী। …কতকগুলি বিস্ময় থাকে যার কারণ বর্ণনা করা যায় না। আমরা বাঙালি, আমাদে জীবনে নদী এমন কিছু নয়। নদী আমাদের অধিকাংশের আজন্মের সাথী। শত সহস্র নদী রয়েছে আমাদের দেশে। তাহলে যে-নদী আমার দেশে আছে বিস্ময় নয়,সে নদীকে এখানে কেন বিস্ময় বলে মনে হলো? বলতে পারব না।“
লেখক ‘বেলগ্রেডের ডাক’য়ে শহরের শিল্পী-বোহেমিয়ানদের প্রাণকেন্দ্র ‘ স্কাদারলিয়া’ অধ্যায়টিকে বেশ গুরুত্ব দিয়ে তুলে এনে্রছেন। তিনি সাহিত্য সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন বলে এই এলাকা দর্শন তাঁর ভ্রমণে মানানসই। বইটির প্রচ্ছদও করা হয়েছে শিল্পী-বোহেমিয়ানপাড়া ‘স্কাদারলিয়া’র ছবি দিয়ে। সকলেই জানি, প্রতিটি শহরেই এমন এলাকা থাকে যা এর আদি ঐতিহ্যকে ধারণ করে রাখে। আধুনিক-স্থাপত্যের বিপুল চাপ ও প্রলোভন সামলে এর শতবর্ষী দালান, ধূলোমলিন ঘরবাড়ি-জীর্ণ রাস্তা হয়ে ওঠে শতাব্দীর গর্বিত স্মারক। স্কাদারলিয়া বেলগ্রেডের সেরকম একটি এলাকা। লেখক এর বর্ণনায় তাঁর ভাষার মাধুর্য ঢেলে দিয়েছেন উজাড়হস্তে…
“ স্কাদারলিয়া এঁদের বিশেষ গৌরবের পাড়া। প্রাচীন সব বাড়ি। কোনো কোনো বাড়ি অতি প্রাচীন, চুণ-বালি-খসা। এমনকি টিনের, টালির একতলা নিচু ছাদ। এই এলাকায় এলে বিচিত্র অনুভূতি জাগে। মানুষ তার আধুনিকতাকে নিয়ে গর্ব করে। কিন্তু তার প্রাচীন প্রদোষের ছায়ায় তার যে গর্বিত অতীত স্তব্ধ হয়ে থাকে তার গৌরব দুর্লভ। “
“….স্কাদারলিয়ার বিবর্ণ ম্লান কিন্তু গভীর প্রাচীন বাড়িগুলির মাথার উপর দিয়ে দূর আধুনিক নগরের উন্নত নীল স্বচ্ছ বাড়িগুলির দু-একটির দিকে যখন নজর পড়ছিল, এখানে পাতা-ঝরা গাছে শীতল ছায়ায় হাঁটতে হাঁটতে তখন আরো গভীরভাবে মনে হচ্ছিল ইতিহাস এখানে নীরব কোলাহলে কথা কইছে।“….কিন্তু স্কাদারলিয়া যে মৃতরূপে নীরব তা নয়। …..আনন্দ আর উপভোগের এ এক অনন্য স্থান।“ (পৃষ্ঠা-৬৯)।
ভ্রমণরচনাটইর প্রতি লেখকের সুবিচারের এরকম আরও অনেক উদাহরণ দেয়া যাবে।
কথাসাহিত্যিক ও গবেষক বশীর আল হেলাল এর অন্য রচনার মতোই ‘বেলগ্রেডের ডাক’এগিয়েছে গদ্যের গভীর মাধুর্যে, যে গদ্যে উচ্চকিত হয়ে ওঠে পাঠকের চেনা এ লেখকের প্রাতিস্বিক কন্ঠস্বর। সৌম্যকান্তি চেহারায় গম্ভীর ব্যক্তিত্বে অটল লেখক পাঠককে মুগ্ধ করতে ভ্রমণের খটখটে কর্মসূচির মধ্যে গুঁজে দেন রসময় গল্প, চিত্রিত করে তোলেন নানা চরিত্র, বর্ণনা দেন চমৎকার প্রকৃতির। এভাবে তিনি একে করে তোলেন সুখপাঠ্য ভ্রমণরচনা ও সর্বজনীন জীবন-দর্শনের আকর। এখানে যে লেখক নিজ কথাসাহিত্যিক সত্তার পূর্ণ মুক্তি ঘটিয়েছেন-তা অত্যূক্তি নয়। এভাবে কথাসাহিত্যিক বশীর আল হেলাল এর অগুণতি রচনার মধ্যে চাপা পড়ে থাকা ভ্রমণগদ্য গ্রন্থটি বাঙালির সাহিত্য-শিল্পের এক অনন্য সম্পদ হয়ে উঠেছে, সে সিদ্ধান্তে পৌঁছতে দ্বিধা থাকে না।





